সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

এমন সময় যে কখন শহরের গাড়ি গুলোর কালো ধোঁয়ার মত কালো মেঘ এসে আকাশ ছেয়ে ফেলেছে তা ওদের দুজনের কেউই খেয়াল করেনি ।



শ্রাবণের এই ভরা দুপুরে যেমনভাবে তাপমাত্রার পারদ লাফিয়ে লাফিয়ে চড়ছে, আকাশের দিকে তাকালেই যেন জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকা নির্মম সূর্যটার ওপরেও রাগের পারদ চড়চড় করে বাড়ছে সিরাজের । সিরাজ এমনিতে খুব ঠান্ডা মাথার ছেলে , বদরাগী বলে আজ অব্দি কমপ্লেক্সের কেউ বদনাম দিতে পারবে না , কিন্তু সকাল থেকেই যেন দিনটা ওর সহনশীলতার পরীক্ষা নিতে উঠেপড়ে লেগেছে , নয়ত কেন খামখা সাততলার পটনায়েক-সাহেব সকাল সকাল গা দিয়ে রসুনের গন্ধ বেরচ্ছে বলে ওকে "কুত্তে কা অওলাদ" বলে গালি দেবেন !! আর তারউপর হয়েছে এই গ্রাউন্ড ফ্লোরের নতুন মালকিনের নতুন কুত্তাটা!! তখন থেকে মরাকান্না জুড়েছে ! কান ঝালাপালা করে দিল একেবারে!! ইস!! সিরাজও মনে মনে কুত্তা বলে ফেলল ! তাহলে ওর আর পটনায়েক সাহেবের মধ্যে পার্থক্য কি থাকল! মনে মনে ভেবে নিজেই হেসে ফেলল সিরাজ ।

মিষ্টির মনেও আজ খুব দুঃখ , ওর অবশ্য মন ভাল থাকলেও মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই , মুখ খানা বড় মায়া ভরা , কিন্তু কেউ কখনও ওকে হাসতে দেখেনি । আগে ও যেখানে থাকত , সেখানে বন্ধুরা ওকে বলত ওর ঠোঁটটাই নাকি ভগবান উল্টো বানিয়েছেন , তাই সবসময় ওর মুখে শুধু দুঃখ আর দুঃখ । তবে যেদিন প্রথম নিঃসন্তান উর্মিলা চৌধুরী ওকে কোলে নিয়েছিলেন , আর বলেছিলেন "আহা কি মিষ্টি মুখ খানা!! ওর নাম আজ থেকে মিষ্টি", সেদিন অব্যক্ত স্নেহের স্পর্শে ওর সদা উল্টোনো মুখ টাও শান্তিতে ভরে গিয়েছিল , বুজে এসেছিল মায়াভরা ডাগর চোখ দুখানি ।

সেদিন থেকে মিষ্টির নতুন বাড়ি এটাই । উর্মিলা চৌধুরীর নিঃসঙ্গ জীবনে অপত্য-স্নেহের কেন্দ্রবিন্দু , সারাদিনের নিষ্ঠুর কঠিন কর্মজীবনের শেষে নিশ্চিন্তে বুকে টেনে নেওয়া নরম তুলতুলে নিষ্পাপ প্রাণটা , উনার মেয়ে মিষ্টি। মিষ্টির দৈনন্দিন জীবনটাও এখন নিশ্চিন্ত বটে , হোমের মত পাউরুটির বড় টুকরোটার জন্য সহবাসীদের সাথে মারপিট করতে হয় না , না চাইতেই এত সব খাবার পায় যা ও কোনোদিন চোখেই দেখেনি , তবে এত কিছু থেকেও যেন সোনার খাঁচায় বন্দীর মত সারাদিন জানালার কাছে বসে থাকে আর জুলজুল চোখে রাস্তার সদা চলন্ত মানুষ গুলোকে দেখতে থাকে । এভাবেই সারাদিন অপেক্ষাতেই কেটে যায় , রাত্রিবেলা উর্মিলাদেবী আসেন , তখন যেন ওর নিস্প্রান চোখ দুটোতে প্রাণের ঝলক খেলে ওঠে।

আজকেও রোজের মতো মিষ্টি বসে ছিল জানালায় , হঠাৎ নিচে চোখ পড়তেই দেখে খোলা গেটের মধ্যে দিয়ে ওরই মত একজন ধুঁকতে ধুঁকতে ছায়ায় এসে বসে পড়ল । রৌদ্রের তাপে প্রাণটা ওই অস্থিসার শরীরের খাঁচার মায়া ছেড়ে এই যায় কি সেই যায় ! দেহের যা অবস্থা , এখনো প্রাণপাখি বেরনোর রাস্তা খুঁজে পায়নি এটাই আশ্চর্য । হয়ত তেষ্টায় বসে পড়েছে অচেনা বাড়ির সামনে । মিষ্টি কি বুঝল ও-ই জানে , মুখ দিয়ে জানলার ধারে রাখা একটা জলের বোতল বাইরে ফেলে দিল । মুর্মূষের ওপর হয়ত ঈশ্বর অজান্তেই সামান্য দয়া করেন, বোতলটি পড়ার সাথে সাথে ফেটে গিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল ওর পায়ের কাছে , তৃষ্ণার্ত দেহে ওটুকুই যেন সঞ্জীবনীর কাজ করল । জলটুকু চেটে খেয়ে সে ওপর দিকে তাকাল , মিষ্টি জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দিল । সৌজন্য আর কৃতজ্ঞতাপূর্ণ ভাষার প্রয়োজন হয়ত তথাকথিত সভ্য সমাজে প্রচলিত , তবে এক্ষেত্রে নীরব দুটি চোখ আর সদ্য প্রাণ ফিরে পাওয়া একটা শান্ত চর্মসার মুখ সে পর্ব হয়ত সন্তোষজনকভাবেই সুসম্পন্ন করল ।
মিষ্টি হাঁ করে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে , মিষ্টির মুখ থেকে দু ফোঁটা লালা চকিতেই পিচ বাঁধান মাটিতে এসে পড়ল । আগন্তুক ততক্ষণে একটু সুস্থ হয়ে এগিয়ে এসেছে ঠিক ওর জানলার নিচেই।  লালার ফোঁটা দুটো পড়ল ঠিক তার পায়ের সামনে । সামনের পা-টা এগিয়ে সে সেটা মুছে দিয়ে কি ব্যক্ত করতে চাইল তা হয়ত মিষ্টির নিষ্পাপ মনই বুঝল ।

এমন সময় যে কখন শহরের গাড়ি গুলোর কালো ধোঁয়ার মত কালো মেঘ এসে আকাশ ছেয়ে ফেলেছে তা ওদের দুজনের কেউই খেয়াল করেনি । প্রকৃতি যেন একটু আগে ঘটে যাওয়া সামান্য "মানবিকতা"র প্রতিচ্ছবিটাই মেলে ধরল নিজের আরশিতে । ঠিক যেভাবে এক তৃষ্ণার্ত প্রাণ ঠিক সময়ে রক্ষা পেল এক ক্ষুদ্র নির্বাক হৃদয়ের "মানবিকতা"র স্পর্শে , প্রকৃতিও যেন অসহনীয় দাবদাহে জ্বলতে থাকা নিজের হাজার হাজার সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে শ্রাবণের বারিধারার সূত্রপাত করল।

বৃষ্টির অঝোর ধারায় একা কপর্দকহীনভাবে ভিজতে থাকল অস্থিসার দেহটা । না জানি কত দীর্ঘক্ষনের অনাহারে ও দীর্ঘদিনের অপুষ্টিতে পাঁজরের হাড় গুলো এতক্ষন যেন রৌদ্রে পোড়া চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছিল , এখন প্রবল বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা গুলো যেন গোলার মত বিঁধতে থাকল তার ওপর , তা সহ্য করার শক্তি দেহটার নেই । তা থেকে বাঁচতে কোনরকমে দেহটা টেনে নিয়ে  সে সামনের ফাঁকা ঘর মত জায়গা টায় ঢুকে পড়ল । মিষ্টির চোখের আড়াল হতেই সে মুখ বাড়িয়ে জানলার বাইরে বের করেও আর দেখতে পেল না । কিছুটা অপ্রসন্ন মনে মিষ্টি আবার এক মনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে মন খারাপ করে নিজের মনের কষ্ট অবোধ্য ভাষায় একটু উচ্চ-স্বরে ব্যক্ত করতে থাকে ।
সকালের অপমান হজম করতে সিরাজ এক বোতল দেশি খেয়ে হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছিল গার্ডস রুমে , ঘুম ভাঙল বৃষ্টির শব্দে । উঠেই ধড়ফড় করে ছুটল গেটের দিকে । কালই পটনায়েক সাহেব নিজে খরচ করে গেটখানা রঙ করিয়েছেন , বার বার করে বলেছিলেন "বারিষ" এলে যেন সিরাজ গেটটা প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে দেয় , সেটা মনে পড়তেই সিরাজ পড়িমড়ি করে ছুটল গেট ঢাকতে । যাক, বেশিক্ষণ হয়নি হয়ত বৃষ্টি আসা , গেট ঢেকে এসে গ্যারেজ দিয়ে ঢুকতে গিয়ে নাকে একটা উৎকট গন্ধ ভেসে আসে , গন্ধের সন্ধান করতে গিয়ে দেখে একটা হাড় বের করা রাস্তার কুকুর গুটি মেরে বসে আছে । সিরাজের দেশির নেশা ততক্ষণে কিছুটা কেটেছে , মাথায় বিদ্যুৎ ঝলকের মত খেলে গেল সকালে পটনায়েক সাহেবের "কুত্তা কা অউলাদ" কথাটা , সাথে কানে ভেসে আসছে আবার গ্রাউন্ড ফ্লোরের নতুন ম্যাডাম উর্মিলার নতুন pug-টার মরাকান্না , নারকীয় রাগে সিরাজের হাতের গার্ডস স্টিক টা প্রবল শক্তিতে আছড়ে পড়ল অস্থিসার দেহ টার ওপর , একটা মর্মন্তুদ আর্তনাদ মিষ্টির করুনসুর ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ল গোটা শূন্য গ্যারেজটা জুড়ে .... সিরাজ পৈশাচিক অভিব্যক্তিতে বিড় বিড় করতে করতে বলে চলল " কুত্তে কি অওলাদ!! সারা জাগাহ কুত্তে কি অওলাদ!! ......"

(বি.দ্রঃ - আপনারা অনেকেই হয়ত জানেন মুম্বাই মহানগরীর মহাজীবনের বুকে ঘটে যাওয়া নিন্দনীয় ঘটনাটি । একটি কুকুর বৃষ্টি থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিয়েছিল একটি কমপ্লেক্সের গ্যারাজে । সেখানকার নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে নির্মম ভাবে আহত হয়ে কুকুরটি মৃতপ্রায় । আমরা সকলে হয়ত পশুপ্রেমী নই , তবে অকারনে এভাবে প্রাণী হত্যা আশা করি সকল সুস্থ মানুষের কাছেই যন্ত্রণা-দায়ক ও আপত্তিকর বিষয় । গল্পটি এই ঘটনা টি কেন্দ্র করেই কল্পনার আধারে নির্মিত, আশা রাখছি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা চোখে পড়লেই প্রতিবাদ আরও তীব্র হবে , পুনরাবৃত্তি বন্ধ হবে)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

"যোগাসনের বিকল্প কিছু নেই" :শিবগঙ্গা টিঙ্কু গঙ্গোপাধ্যায়

  আজকাল সুস্থ থাকার জন্য আমরা বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে থাকি। ইদানীং কালে খুব কম বয়সে হৃদরোগের কিংবা ডায়াবেটিসের সমস্যা থেকে আরও জটিল প্রাণঘাতী রোগ আমাদের শরীরে বাসা বাঁধছে। প্রতিদিন সময়ের তালে ছুটে চলার তাগিদে আমাদের জীবন ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে। আর এই কঠিন সময়ে শরীরচর্চার যে সময়টুকু পাওয়া যায়, আমরা অনেকেই জিমে গিয়ে ভারী ভারী লোহালক্কর তুলে থাকি আবার অনেকেই ভোরবেলা হেঁটে থাকেন। প্রাচীন কাল থেকে যোগঅভ্যাস আর প্রাণায়ামের সুখ্যাতি আছে। অনেকেই অভ্যাস করে থাকেন। অনেকের জীবনে   বদলে দিয়েছে যোগঅভ্যাস। তবে জিম না যোগঅভ্যাস এই নিয়ে তুমুল তর্কবিতর্ক আছে। নাকি শুধুমাত্র হাঁটলেই মিলবে অনেক রোগ থেকে মুক্তি? তর্ক চলবেই। অনেক বিশেষজ্ঞরা অনেক পরামর্শ দিয়েই থাকেন তবে কোভিড পরবর্তী সময়ে যোগঅভ্যাসের একটা বিরাট প্রচলন শুরু হয়েছে। বিশেষত একটা সময় বয়স্করা প্রতিনিয়ত যোগঅভ্যাস করে থাকলেও ইদানীং সববয়সীদের মধ্যে এই প্রচলন দেখা যাচ্ছে। যোগব্যায়াম বিশেষজ্ঞ শিবগঙ্গা টিঙ্কু গঙ্গোপাধ্যায় আটপৌরের মুখোমুখি হয়ে জানালেন যে," যোগব্যায়ামের বিকল্প কিছু নেই। প্রাণায়াম এবং যোগব্যায়াম একজন মানুষকে সম্পূর্নরূপে বদলে দিত...

কেয়া পাতার নৌকা

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------   সঞ্জয় ঘোষ কেয়া পাতার নৌকো ভাসে,                 ছোট্টো বোনের রাখির সাথে,                   অপেক্ষার নদী প্রবাহে বয়                   ভাইফোঁটা তার স্মৃতিতে রয়। কেয়া পাতার সেই নৌকো ভাসে,     পদ্মা নদীর প্রবাহের সাথে, কাঁটাতাঁরের সেই সাজানো ফাঁকে,     মাঝির ভাঁটিয়ালি গান বাজে।              বঙ্গভঙ্গ হোক না যতই,            এমন কাঁটাতাঁর তৈরি কতই,             রাখিবন্ধন, ভাইফোঁটাতে                এমন নৌকো ভাসবে ততই। কেয়া পাতার সেই নৌকো থামে       পদ্মা নদীর ওপার গ্রামে,   দাদার হাতে ঐ রাখি সাজে,   শঙ্খের নিনাদ সারা বাংল...

প্রথম লোকটা বেশ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘’ ধুর বাল! আপনি কি কিছু বলবেন নাকি একবারে ওপরে উঠে বললেন? ‘'

‘’ দাদা , দেশলাই হবে নাকি ?’’ খালের ধারে বসে থাকা অন্য লোকটি একবারে নিশ্চুপ ! প্রথম লোকটির কথা সে হয়ত শুনতেও পেল না । কিন্তু অন্য লোকটি মুখে একটা বিড়ি ধরিয়ে বেশ হন্তদন্ত হয়ে দেশলাই খুঁজছে । লোকটি আবার বলল , ‘’ ও দাদা , দেশলাই হবে নাকি ?’’ কিন্তু কোনও কথায় লোকটির কানে গেল না ! এবার সেই প্রথম লোকটি দ্বিতীয় লোকটির কাছে এসে বলল , ‘’ আরে দাদা , যা হওয়ার তা হয়ে গেছে , ওসব নিয়ে ভেবে আর লাভ নেই । ‘’ বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামবে । ব্রিজের নীচে খালটা এমনই ফাঁকাই থাকে , কিন্তু আজ বেশ ভিড় । বিশেষত পুলিশ এবং সাংবাদিকদের । তবে এই দু ’ জন তার থেকে অনেকটা দূরে একটা নিরিবিলি জায়গায় আছে । সামনেই রেললাইন । যদিও এই লাইনে ট্রেন খুব একটা আসা যাওয়া করে না । সারাদিনে হয়ত পাঁচ জোড়া । খালের জল ধীর গতিতে বয়ে চলেছে । তবে যতদূর দেখা যায় , খালের সামনেটা বেশ নোংরা ! কয়েকটা কুকুর মরা পড়ে রয়েছে । বেশ গন্ধও বেরোচ্ছে । তবে ঐ দু ’ জন ব্যক্তি সেই সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন ।   প্রথম লোকটি দেশলাই না পেয়ে কিছুটা বিরক্ত হয়েই দ্বিতীয় লোকটির পাশে বসে পড়ে বলল, ‘’ ধুর শালা! কী জন্য বেড়িয়েছিলাম আর কী হয়ে ...